বাংলাদেশের মফস্বল শহর থেকে উঠে এসে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় Massachusetts Institute of Technology (MIT)-এ পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা, আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে দেশের প্রতিনিধিত্ব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে গবেষণা এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ—এসব অর্জন একসঙ্গে খুব কম তরুণের জীবনেই দেখা যায়। সেই ব্যতিক্রমী তরুণদের একজন মোহাম্মদ নাফিস উল হক সিফাত।
চাঁদপুরের এই মেধাবী শিক্ষার্থী আজ শুধু নিজের নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনাকেও বিশ্বদরবারে তুলে ধরছেন। তাঁর যাত্রা প্রমাণ করে, আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তিবিদ হয়ে ওঠার জন্য জন্মস্থান নয়, মেধা, অধ্যবসায় এবং সঠিক প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় শক্তি।
চাঁদপুর থেকে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে
মোহাম্মদ নাফিস উল হক সিফাতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা চাঁদপুর শহরের ষোলোঘর পাবলিক লাইব্রেরি এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তাঁকে আলাদা করে তোলে।
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন হাসান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে বিজ্ঞান বিভাগে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
২০২৩ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান MIT-এর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে সম্পূর্ণ স্কলারশিপসহ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। প্রতিবছর বিশ্বের হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থী যেখানে আবেদন করেন, সেখানে নির্বাচিত হওয়া নিজেই একটি অসাধারণ অর্জন।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের পতাকা
নাফিসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি শুরু হয় International Olympiad in Informatics (IOI) থেকে।
তিনি ২০২১ এবং ২০২২ সালে পরপর দুই বছর বাংলাদেশের হয়ে অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন। বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কম্পিউটার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোর একটি হিসেবে IOI পরিচিত, যেখানে শতাধিক দেশের সেরা শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
পরপর দুই বছর পদক জয় বাংলাদেশের তরুণ প্রোগ্রামারদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় কাজ
শুধু একাডেমিক সাফল্যেই নয়, বাস্তব প্রযুক্তি গবেষণাতেও নিজের অবস্থান তৈরি করছেন নাফিস।
তিনি Artificial Intelligence (AI) এবং Computational Technology-এর বিভিন্ন গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম আগ্রহের ক্ষেত্র হলো স্মার্টওয়াচ সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের মানসিক অবস্থা শনাক্তকরণ।
এছাড়া তিনি এআই অবকাঠামো নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি স্টার্টআপ DeepInfra-তে কাজের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন, যেখানে আধুনিক AI মডেল ও কম্পিউটিং অবকাঠামো নিয়ে কাজ করা হয়।

প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংয়েও সমান দক্ষ
প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিং জগতেও নাফিস একটি পরিচিত নাম।
জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম Codeforces-এ qwerty190 হ্যান্ডেল ব্যবহার করে তিনি ৮০০-এর বেশি সমস্যার সমাধান করেছেন এবং Candidate Master রেটিং স্পর্শ করেছেন—যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংয়ে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম
নাফিস উল হক সিফাতের গল্প কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়; এটি বাংলাদেশের সম্ভাবনার গল্প।
চাঁদপুরের মতো একটি মফস্বল শহর থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গবেষণার মূলধারায় নিজের অবস্থান তৈরি করা দেখিয়ে দিয়েছে—বিশ্বমানের স্বপ্ন পূরণ করতে ভৌগোলিক অবস্থান নয়, প্রয়োজন সঠিক প্রস্তুতি, অধ্যবসায় এবং শেখার অদম্য ইচ্ছা।
বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী যারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণায় ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাঁদের জন্য নাফিস উল হক সিফাত আজ নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণার নাম।
এক নজরে নাফিস উল হক সিফাত
- 📍 জন্মস্থান: চাঁদপুর
- 🏫 বিদ্যালয়: হাসান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
- 🎓 কলেজ: চাঁদপুর সরকারি কলেজ (বিজ্ঞান বিভাগ)
- 🇺🇸 বর্তমান শিক্ষা: Massachusetts Institute of Technology (MIT), USA
- 🏅 IOI ব্রোঞ্জ পদক: ২০২১ ও ২০২২
- 🤖 গবেষণার ক্ষেত্র: Artificial Intelligence, Computational Technology
- 💼 কর্মঅভিজ্ঞতা: DeepInfra
- 💻 Competitive Programming: Codeforces Candidate Master (Handle: qwerty190), ৮০০+ সমস্যা সমাধান
প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে নাফিস উল হক সিফাতের মতো তরুণদের সাফল্যের গল্প আরও বেশি করে তুলে ধরা জরুরি। কারণ এমন গল্পই আগামী প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে শেখায়। লেখাঃ মামুনুর রসীদ, সম্পাদনাঃ বাংলা বিয়ন্ড ও ডেইলি চাঁদপুর



